মনোরমা বসু মাসিমা

altচন্দ্রদ্বীপ। বরিশালের পূর্বনাম। এটি ছিল তৎকালীন বঙ্গ প্রদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন-সংগ্রামে বরিশালের অবদান নানাদিক দিয়ে শ্রেষ্ঠতম। বরিশালের বানরীপাড়া ছিল সশস্ত্র বিপ্লববাদীদের তীর্থস্থান। বানরীপাড়ার পরে স্বরূপকাঠীর নাম উল্লেখযোগ্য। মূলত বরিশালের বানরীপাড়াই বিপ্লবীদের প্রধান ঘাঁটি ছিল। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে বানরীপাড়া ও স্বরূপকাঠী সর্বোচ্চ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে। নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী কমিউনিস্টরা। তাদের মধ্যে মনোরমা বসু মাসিমা অন্যতম।
বানারীপাড়া ও স্বরূপকাঠীর বুক চিঁড়ে বয়ে গেছে বিখ্যাত সন্ধ্যা নদী। নদীর দুই কূল ঘেঁষে রয়েছে অসংখ্য গ্রাম। নরোত্তমপুর তার মধ্যে একটি। বানারীপাড়া থানার নরোত্তমপুর গ্রামে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলন-সংগ্রামের বহু নেতা-কর্মী ও সংগঠকের জন্ম। এ গ্রাম বানারীপাড়া থানার দেশপ্রেমিকদের তীর্থস্থান।
উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, নারীমুক্তি আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম পথিকৃৎ মনোরমা বসু মাসিমার জন্ম ১৮৯৭ সালের ১৮ নভেম্বর। বরিশাল জেলার বানারীপাড়া উপজেলার নরোত্তমপুর গ্রামে। মা প্রমোদ সুন্দরী। বাবা নীলকণ্ঠ রায়। তার জন্মের ১১ বছর পর নীলকণ্ঠ রায় মারা যান। মনোরমার একটি ছোট ভাই ছিল। বিধবা মা দুই সন্তানকে তাই বেশি লেখাপড়া করাতে সক্ষম হননি। পড়াশুনার হাতেখড়ি পরিবারে। তারপর পাঠশালা ও প্রাইমারি স্কুল। এরপর তার আর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি।
মাত্র ১৪ বছর বয়সে গৌরনদীর বাঁকাই গ্রামের জমিদারপুত্র চিন্তাহরণ বসুর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। চিন্তাহরণ বসু ছিলেন উদারমনা ও প্রগতিবাদী। স্বামীর সহযোগিতায় ও সমর্থনে মনোরমা বসু স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। সংসারধর্ম পালনের পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজেও যুক্ত হয়ে পড়েন। ১৯০৫-১১ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে তিনি অংশ নেন। মিছিলের মধ্যে তিনি মানুষের হাতে হলদে সূতার রাখী বেঁধে দেশমাতৃকার জন্য বিপ্লবী কাজে উৎসাহ যোগাতেন। ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরামের ফাঁসি তাকে প্রচণ্ডভাবে দুঃখ দেয় এবং আলোড়িত করে। মনে মনে শপথ নেন, এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তিনি ভবিষ্যতে রাজনীতি করবেন।
১৯২১-২২ সালের ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সশস্ত্র বিপ্লববাদী দলের কর্মকাণ্ডে মাসিমা আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন। ১৯২৪ সালে মহাত্মা গান্ধী বরিশালে আসেন। এ সময় মনোরমা বসু মহাত্মা গান্ধী’কে দেখার জন্য বরিশালে আসেন। মহাত্মা গান্ধী’র প্রাণবন্ত বক্তব্য শুনেন। আরো শুনেন মুকুন্দদাসের ‘মাতৃপুঁজা’ যাত্রাপালার সেই মরণজয়ী ‘ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে’ জাগরণী সঙ্গীত। এরপর থেকে মাসিমা মুকুন্দদাসের কাশিপুরের কালী মন্দিরে যাওয়া আসা শুরু করেন। সেখানে পেয়ে যান- শতদলবাসিনীকে। শতদলবাসিনী মুকুন্দদাসের সহধর্মিনী ছিলেন। তিনি মাসিমা’কে আদর-স্নেহ দিয়ে গড়ে তুলতে শুরু করলেন। ধীরে ধীরে যুক্ত হয়ে পড়লেন নারী সমাজকে সচেতন করে গড়ে তোলার কাজে। তখন থেকে মাসিমা কংগ্রেসের কর্মকাণ্ডে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে থাকেন। এ সময় মাসিমা বরিশাল শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
১৯৩০ সাল। তখন সারা ভারত জুড়ে চলছিল আইন অমান্য আন্দোলন। বঙ্গ প্রদেশেও এর উত্তাল ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। এই আন্দোলনে মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ব্রিটিশ পুলিশ মনোরমা বসুকে গ্রেফতার করে। জীবনের প্রথমবারের মতো কারাবন্দী হন তিনি। এ সময় তার ৬ মাস জেল ও ১৫০ টাকা জরিমানা ধার্য করে ব্রিটিশ বিচারক। প্রায় ছয় মাস পর মুক্তি পান। জেল থেকে বেরিয়ে তিনি আরও সক্রিয়ভাবে শুরু করেন রাজনীতি। গড়ে তুলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। সেই সঙ্গে পূর্ণোদ্যমে শুরু করেন মহিলাদের সংগঠিত করার কাজ। এই জন্য তিনি গড়ে তোলেন মহিলা সমিতি। এই সমিতি পরিচালনাকালে তিনি বিপ্লবী গ্র“পের সাথে পরিচিত হন। ১৯৩৩-৩৪ সালে তিনি পাশাপাশি নিজ বাড়ির বারান্দায় চালু করেন মেয়েদের বিদ্যালয়। নিজের মেয়েসহ আরো ৫ জন মেয়েকে নিয়ে শুরু করেন স্কুলের কার্যক্রম। নিজের ব্যবহৃত ৫ ভরি সোনা ও মুষ্ঠি চাল বিক্রি করে এই স্কুলটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই বিদ্যালয়ই বিখ্যাত ‘মাতৃমন্দির’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
চল্লিশ দশকের আন্দোলনমুখর দিনগুলোতে মনোরমা বসু ভীষণভাবেই কর্মব্যস্ত থাকেন। এ সময় তিনি ব্রিটিশ বিরোধী জনমত গঠনে, কংগ্রেসের কাজে, মহিলাদের সংগঠিত করার কাজে, মেয়েদের শিক্ষাদানে ও মানুষের অধিকার স্বাধীনতার আন্দোলনে যুক্ত থাকেন। তার প্রাণপণ চেষ্টায় বরিশালে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়াও তিনি এ দশকে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের কাজেও যুক্ত ছিলেন।
১৯৪৩-৪৪ সাল। ব্রিটিশ শাসকদের অবহেলার কারণে সারা বাঙলায় দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম-বাংলার আনাহারী মানুষ খাবারের জন্য ছুটছে কলকাতার দিকে। ওলিতে-গলিতে, রাজপথে-ফুটপথে অগণিত মানুষ ক্ষুধার তাড়নায়-যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। কাক ও কুকুরের সঙ্গে বুভুক্ষু মানুষ অখাদ্য-কুখাদ্য খুঁজে ফিরছে ডাস্টবিনে-নর্দমায়। এ সময় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজেও তিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে দাঁড়ান আর্তমানুষের পাশে। সমগ্র বরিশাল জুড়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কাজে শত শত মহিলাদের নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ান।
সারা বাঙলায় মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গড়ে তোলেন বরিশালের দুই কৃতি নেত্রী- মণিকুন্তলা সেন ও যুঁইফুল বসু। তাদের সহযোগিতায় মাসিমা বরিশালের গ্রামাঞ্চলেও এই সমিতির কাজ ও সংগঠন বিস্তৃত করেন। মূলত বরিশালে মাসিমার নেতৃত্বে মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি গড়ে ওঠে। তিনি বরিশাল জেলার সম্পাদক ও সংগঠক ছিলেন।
১৯৪৪ সালের মে মাসে বরিশালে নিখিলবঙ্গ মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের সকল কাজ তার নেতৃত্বে সম্পন্ন হয়েছিল। ১৯৪৫ সালের সম্মেলনেও মাসিমা একজন সংগঠকের ভূমিকা রাখেন। এই সম্মেলনের পর তিনি ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মহিলাদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুধু বরিশালে নয়, বরিশালের বানারীপাড়া, স্বরূপকাঠি, নাজিরপুর, কাউখালী, ঝালকাঠী, পিরোজপুর, মাটিভাঙ্গার প্রতিটি গ্রামে গ্রামে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন।
১৯৪৭ সাল। দেশভাগ হল। জন্ম নিল সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র পাকিস্তান। এ সময় পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও হামলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। মাসিমাকে দেশ ত্যাগের জন্য অনেকেই পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু দেশমাতৃকাকে ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না বলে মনস্থির করলেন। নিজ মা-মাটিতে অবস্থানের জন্য অনড় থাকেন মনোরমা বসু।
১৯৪৮ সালের ৫ জুন হঠাৎ চালের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর প্রতিবাদে বরিশালে আন্দোলন গড়ে তোলেন তিনি। হাজার হাজার মানুষ এ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশও সমবেত হয়। ব্রজমোহন কলেজের ছাত্ররা যোগ দেয় বিক্ষোভে। অচিরেই শুরু হয় লাঠিচার্জ। গ্রেফতার করা হয় মনোরমা বসু মাসিমাকে। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধাচরণের ফলে ভেঙ্গে দেওয়া হয় মাতৃমন্দির। চার বছর কারাভোগ শেষে ১৯৫২ সালের ২৫ এপ্রিল মুক্তি পান।
১৯৫০ সালে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধালো। দাঙ্গা বিরোধী প্রতিরোধ গড়ে তুললো কমিউনিস্ট পার্টি। এ সময় বরিশালের প্রায় সকল কমিউনিস্ট নেতাকে সরকার গ্রেফতার করে। মুকুল সেন ও জগদীশ আইচকে গ্রেফতার করতে সরকার ব্যর্থ হয়।
মুক্তিলাভের পর মনোরমা বসু মাসিমা ৫২’র মে মাসে ইস্পাত দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ভেঙ্গে ফেলা মাতৃমন্দিরকে পুনরায় গড়ে তোলেন। এ সময় বিপ্লবী সত্যেন সেন গানের মাধ্যমে বরিশালে মনোরমা বসু মাসিমার ‘মাতৃমন্দির’র জন্য তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টিও তাকে এ কাজে সহযোগিতা করে।
সাথে সাথে শুরু করেন পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নানা কার্যক্রম। যুক্ত হন যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী কাজে। ১৯৫৪ সালে তার স্বামী চিন্তাহরণ বসু মারা যায়। কিন্তু যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতনের পর পরই মনোরমা বসু মাসিমাকে ঘিরে আবার শুরু হয় পুলিশি হয়রানি ও ষড়যন্ত্র। কৌশলে গ্রেফতার এড়ান তিনি। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে দীর্ঘদিন তিনি আত্মগোপনে থাকেন। ইতোমধ্যে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে এসে সদস্য পদ পান। আত্মগোপনে থাকাকালীন সময়ে বরিশালের বিভিন্ন জায়গায় পার্টির কাজে নিজেকে নিয়েজিত করেন। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে তার ওপর থেকে গ্রেফতারী পরোয়ানা উঠে যায়। এরপর তিনি নিজ বাড়িতে মাতৃমন্দির আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়, পল্লী কল্যাণ অমৃত পাঠাগার ও মুকুল মিলন খেলাঘর গড়ে তুলেন।
স্বৈরশাসক আইয়ুব খান, ক্ষমতা দখলের মাত্র ২ মাস পর ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। এই কমিশন ১৯৫৯ সালে আগস্ট মাসের মধ্যে একটি শিক্ষা রিপোর্ট প্রণয়ন করে। ২৭ অধ্যায়ে বিভক্ত এই রিপোর্টে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর পর্যন্ত সাধারণ, পেশামূলক শিক্ষা, শিক্ষক প্রসঙ্গ, শিক্ষার মাধ্যম, পাঠ্যপুস্তক, হরফ সমস্যা, প্রশাসন, অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিষয়ে বিস্তারিত সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। এতে আইয়ুব খানের ধর্মান্ধ, ধনবাদী, রক্ষণশীল, সাম্রাজ্যবাদী শিক্ষাসংকোচন নীতির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছিল। ছাত্র ইউনিয়ন আইয়ুবের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৫৯ সালে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে একুশ উদযাপনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ১৯৬০ ও ১৯৬১ সালে এ ধরণের উদ্যোগ অব্যাহত থাকে। প্রকৃতপক্ষে ছাত্র ইউনিয়নই ছিল আন্দোলনের মূল পরিচালক। আইয়ুব সরকার এই রিপোর্টের সুপারিশ গ্রহণ করে এবং তা ১৯৬২ সাল থেকে বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। এ সময় বরিশালে মাসিমা শত শত ছাত্রীদেরকে এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত করে দেন। তিনি ছাত্র ইউনিয়নকে এবং শিক্ষা আন্দোলনকে সংগঠিত করার ব্যাপারে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। ১৯৬২-৬৮ সাল পর্যন্ত স্বৈরাচার আইয়ুব খান বিরোধী সকল আন্দোলনে তিনি ছাত্র-যুব ও পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। এ সকল আন্দোলনে তিনিই একমাত্র মহিলাদেরকে সংগঠিত করণে আবদান রাখেন।
১৯৬৪ সালের দাঙ্গাবিরোধী কর্মকাণ্ডে মাসিমা জোরদার দায়িত্ব গ্রহণ করে তা যথাযথভাবে পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তার ভূমিকা চিরস্মরণীয়। তিনি সমগ্র বরিশাল জুড়ে এ সময় আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করেন। ১৯৭০ সালে তিনি ঘূর্ণিদুর্গত এলাকায় মহিলাদের সংগঠিত করে ত্রাণকার্য বিতরণ ও আর্তমানুষের সেবায় নিজেকে নিয়েজিত করেন। ৭০-এর নির্বাচনে তিনি পার্টির প্রার্থীর পক্ষ্যে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। এ সময় তিনি পিরোজপুরের নিরোদ নাগের সাথেও পার্টির কাজ করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর সাথে যুক্ত হয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের দিনগুলোতে মহিলাদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মনোরমা বসু। স্বাধীনতার পর বরিশালেই তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মনোরমা বসু মাসিমার দেশপ্রেম, সমাজসেবা, মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার কারণে ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষের কাছে তিনি মাসিমা হিসেবে পরিচিত হন। মূলত শত শত মেয়েরা যাদেরকে মাসিমা আদর-স্নেহ-ভালবাসা দিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন, তারাই তাকে মায়ের মত আপন ভেবে ‘মাসিমা’ বলে ডাকতো।
স্বাধীনতার পর মাসিমা পাকবাহিনীদের ভেঙ্গে দেয়া মন্দির ও স্কুল পুনরায় পুনর্গঠন করেন। ৭২ সালে তিনি বরিশালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের শাখা তৈরি করেন। মহিলা পরিষদের সহ-সভাপতি হিসেবে তিনি বরিশালে সংগঠন গড়ে তোলার দায়িত্ব নেন। ৭৩-এর নির্বাচনে তিনি তার দায়িত্ব পালন করেন। ৭৪-এর দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় আসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেন। ওই বছর ৮ মে তিনি মহিলা পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে রাশিয়া সফর করেন। ৭৫-এর বাকশালে যোগদানের বিরোধীতা করেন। ১৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ও অস্থিরতার জন্য পার্টির সিদ্বান্তে আত্মগোপনে যান। আত্মগোপনে থেকে তিনি খেলাঘর, ছাত্র ইউনিয়ন, মহিলা সমিতি ও উদীচীসহ আরো অনেক গণসংগঠনের কাজে যুক্ত থেকে ওই সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করে গড়ে তোলেন। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সরাসরি যুক্ত থাকতে না পারলেও নেতা-কর্মীদের উৎসাহ যোগাতেন প্রতিনিয়ত। ১৯৮৬ সালের ১৬ অক্টোবর তিনি মারা যান। লাল সালাম মাসিমাকে।

লেখক: শেখ রফিক

তথ্যসূত্র:
১. মনোরমা মাসিমা- সত্যেন সেন, প্রকাশক: কে এম ফারুক খান, ৬৭, প্যারিদাস রোড, ঢাকা, প্রকাশকাল ১৪ আগস্ট ১৯৭০।
২. মনোরমা বসু মাসিমা- বদিউর রহমান, প্রকাশক: আগামী প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৩।
৩. মনোরমা বসু স্মৃতি ট্রাস্ট কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকা ‘এক আলোর শিখা’, প্রথম প্রকাশ ২০০৭।
৪. সাপ্তাহিক একতা, ১০ অক্টোবর ২০০৪।
৫. www.biplobiderkotha.com

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.