হাজী শরীয়তুল্লাহ

 

alt শরীয়তপুর পদ্মার তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এক জনপদ ফরায়েজী আন্দোলনের রূপকার হাজী শরীয়তুল্লাহর স্মৃতিধন্য এই শরীয়তপুর ইতিহাস সমৃদ্ধ বিক্রমপুরের দক্ষিণাঞ্চল এবং প্রাচীন বরিশালের ইদিলপুর পরগণার কিছু অংশ নিয়ে বর্তমান শরীয়তপুর জেলা গঠিত। ব্রিটিশ-ভারতে ও বাংলাদেশের মুক্তির সংগ্রামে শরীয়তপুরবাসীর ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। ১৮৭৩ সালে মাদারীপুর মহাকুমাটি ফরিদপুর জেলার সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জেলাটি ফরিদপুরের মাদারীপুর মহকুমার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ১৯৭৭ সালের ৩ নভেম্বর বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেতা হাজী শরীয়তুল্লাহর নামানুসারে শরীয়তপুর নামকরণ করা হয়। 

 

নারিকেলবাড়িয়ায় তিতুমীরের বাঁশেরকেল্লার লড়াইয়ের পর ফরিদপুরে নতুন করে গড়ে ওঠে স্বাধীকার আন্দোলন আর এ আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহতিনি সরাসরি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিগ্রহে না গিয়ে সাধারণ মুসলমানদেরকে ঈমান আকিদার প্রশ্নে একতাবদ্ধ করতে লাগলেন তিনি জনগণকে ইসলামের মূল কর্তব্যসমূহ তথা ফারায়েজ (শরীয়তের অবশ্য পালনীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য) শিক্ষাদানে নিজেকে নিয়োজিত করেনএভাবে তিনি যে সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর নাম ফারায়েজী আন্দোলনযারা এই কর্তব্যসমূহ যথাযথভাবে পালন করেন তাদেরকে ফারায়েজী বলা হয় ফরিদপুরের মানুষ ধীরে ধীরে তার নেতৃত্বে এক বিশাল আন্দোলন গড়ে তোলে ইতিহাসে এই আন্দোলনই ফরায়েজী আন্দোলন নামে খ্যাত। তিনি ছিলেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামী মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রপথিক

 

ইসলামের সে সমস্ত ফরজ রয়েছে যেমন- মুখে কালিমা বলা, পাঁচ ওয়াক্ত নামায কায়েম করা, রমজান মাসের রোজা রাখা, যাকাত দেয়া, হজ্ব করা এবং অন্যান্য ফরজ পালন করা প্রতিটি ফারায়েজী ভাই-এর জন্য আবশ্যক সাথে সাথে তিনি তার অনুসার সাধারণ মুসলমানের মধ্যে প্রচার করতে থাকেন যে, “‘লাঙ্গল যার জমিন তার এই ঘোষণার মাধ্যমে বাংলার নির্যাতিত কৃষকদেরকে তিনি ঐক্যৈবদ্ধ ও সংগঠিত করেনতিনি ঘোষণা করেন যে, “এই জমিন আল্লাহসুতরাং খাজনা দিব আল্লাহকেব্রিটিশ অথবা তাদের সহযোগী হিন্দু জমিদারকে কোনো খাজনা দেয়া যাবে না তাছাড়া তিনি সরকারী খাস মহলগুলো দখলে এনে গরীব কৃষকদের মাঝে বিতরণ করতেন

ফরায়েজি আন্দোলন ধর্মী সংস্কারের উদ্দেশ্যে সূচিত হলেও পরবর্তীতে এটি কৃষকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রূপ লাভ করেহাজী শরীতুল্লাহ ফরিদপুর ও তার আশে-পাশের অঞ্চলে আন্দোলন সংগঠিত করেন এবং এর নেতৃত্ব দেনধর্মী সংস্কারের পাশপাশি কৃষকদের জমিদার, নীলকরদের অত্যাচার ও শোষ হতে মুক্ত করা ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য

হাজী শরীয়তুল্লাহর জন্ম ১৭৮১ সালে। বৃহত্তর ফরিদপুর জেরার বর্তমান শরীয়তপুর জেলার শিবচর  উপজেলার শ্যামাইল-এর বাহাদুরপুর গ্রামের তালুকদার পরিবারে। তার বাবার নাম আবদুল জলিল তালুকদার। তিনি ছিলেন একজন ভদ্র, দয়ালু একজন প্রজাবৎসল জমিদারএ কারণে সবাই তাঁকে ভালোবাসতো অন্যান্য তালুকদারের মতো তিনি সাধারণ প্রজাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন করতেন না সাধারণ প্রজাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার সাথে তিনি ভাগাভাগি করে নিতেন। সাহায্য করতেন সাধ্য মতোএজন্যে তাঁর নামটি ছড়িয়ে পড়েছিলো অনেক দূর পর্যন্ত

 

শরীয়তুল্লাহ জন্ম এমন একটি পরিবারে আবদুল জলিল তালুকদার চেয়েছিলেন তাঁর ছেলেও হবে মানুষের মতো মানুষ শিক্ষিত এবং আদর্শবান হবে সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করবে। বাবা আবদুল জলিল তালুকদারের এই স্বপ্ন শরীয়তুল্লাহ পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর পিতা তা দেখে যেতে পারেননি শরীয়তুল্লাহর বয়স যখন আট বছর তখন তিনি (১৭৮৯ সালে) মারা যান। তিনি তখন তার চাচা মুহাম্মদ আজিম ও তার স্ত্রীর আশ্রয়ে বড় হতে থাকেন। মুহাম্মদ আজিমের কোনো সন্তান ছিলনা। শরীয়তুল্লাহর মা (নাম জানা যায়নি) তার বাবার আগে মারা যান।

শরীয়তুল্লাহর পড়াশুনার হাতেখড়ি তাঁর পরিবারের বিশেষ করে বাবার কাছে তারপর গ্রামের মক্তবে১২ বছর বয়সে চাচার সাথে রাগ করে ১৭৯৩ সালে তিনি কলকাতা চলে যানকলকাতায় গিয়ে শরীয়তুল্লাহ বিখ্যাত আলেম ও কোরান শিক্ষক মাওলানা বশারত আলীর সাক্ষাত পানবালক শরীয়তুল্লাহর শিক্ষার প্রতি আগ্রহ দেখে মাওলানা বশারত আলী তাকে কোরান শিক্ষা ক্লাশে ভর্তি করিয়ে নেন। অত্যন্ত আন্তরিকতা ও স্নেহের সাথে তিনি শরীয়তুল্লাহকে কোরান শিক্ষা দিলেন। তারপর তিনি শিক্ষকের পরামর্শে হুগলী জেলার ফুরফুরায় যান। ফুরফুরাতে তিনি আরবী ও ফার্সী ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন।

এরপর তিনি তার আরেক চাচা আশিক মিয়ার কাছে যান। তিনি মুর্শিদাবাদের কোর্টে কর্মরত ছিলেন। সেখানে গিয়ে শরীয়তুল্লাহ আরবী ও ফার্সী ভাষা অধ্যায়ন অব্যহত রাখেন। এখানে এক বছর অবস্থান করার পর তিনি তার চাচা আশিক মিয়ার সাথে নিজ গ্রামে যাওয়ার সিদান্ত নেন। তারা চাচা গ্রামে যাওয়ার জন্য একটি ছোট নৌকা ভাড়া করেন। নৌকা চলছে গঙ্গার বুক দিয়ে হঠাৎ শুরু হয়ে গেলো গঙ্গার বুকে এক প্রচন্ড ঝড়ঝড়ের কবলে পড়ে মুহূর্তেই নৌকাটি গঙ্গার বুকে ডুবে যায়। সেই ঝড় আর ঢেউকে উপেক্ষা করে শরীয়তুল্লাহ সাঁতরিয়ে কূলে উঠে দাঁড়ালেন প্রাণে বেঁচে গেলেন তিনি কূলে উঠে তিনি গঙ্গার দিকে তাকিয়ে কোথাও খুঁজে পেলেন না চাচা, চাচী এবং সেই নৌকাটিকে। এই দুর্ঘটনায় শরীয়তুল্লাহ বেচে গেলেও তার চাচা ও চাচি মারা যান। চাচা-চাচি মারা যাওয়ার শোকে তিনি বাড়ি যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। গ্রামে আসা আর হলো না। অবশেষে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। তার পুরানো শিক্ষক মাওলানা বশারত আলীর সাথে দেখা করেন এবং এই দুর্ঘটনার কথা তাকে বলেন। তিনি সব শুনে ব্যতীত হলেন এবং তাকে স্বান্তনা দিলেন।

ওই সময় মাওলানা বশারত আলী ব্রিটিশ শাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে মক্কায় চলে যাওয়ার সিদান্ত নেন। শরীয়তুল্লাহও শিক্ষকের সঙ্গে মক্কায় যাওয়ার জন্য মত প্রকাশ করেন। ১৭৯৯ সালে দুজন মিলে মক্কায় যান। মক্কায় তিনি বাঙ্গালী মাওলানা মুরাদের কাছে আরবী সাহিত্য ও ইসলামী আইন শিক্ষা গ্রহণ করেন। এসময় তিনি মাওলানা মুরাদের বাসগৃহে ছিলেন।

এরপর শরীয়াতুল্লাহ হানাফী আইনজ্ঞ মওলানা তাহের সোম্বলের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ফরায়েজীদের মতে মওলানা তাহের সোম্বল ছোট আবু হানিফা নামে খ্যাত ছিলেন। এই জ্ঞানী সংস্পর্শে এসে শরীয়তুল্লাহ ধর্মীয় বিজ্ঞানের সকল শাখায় জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হন। একই সঙ্গে তিনি সুফিবাদ সম্পর্কে বিস্তার জ্ঞান লাভ করেন। এসময় তিনি সুফিতত্বের কাদেরিয়া তরীকার একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হন।

এরপর তিনি কায়রো শহরেরে বিখ্যাত আলআজাহার বিশ্ববিদ্যালয় তিনি আরবী সাহিত্য, হাদীস, আফসীর, ফিকাহ্ ও ইসলামী শিক্ষা শাস্ত্র সম্পর্কে পড়াশুনা করেন।  

হাজী শরীয়তুল্লাহ সুদূর মক্কাতেও একজন উচ্চ শিক্ষিত আলেম হিসাবে বিশেষ খ্যাতি লাভ করতাঁর পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে সেখানকার মানুষ তাকে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করলেনহাজী শরীয়তুল্লাহ মক্কায় বিশ বছর অবস্থান করা সময়ে শিক্ষকতার পেশা বেছে নেন

 

১৮১৮ সালে তিনি দেশে ফিরে এলেনদেখলেন তাঁর একমাত্র জীবিত চাচা মুহাম্মদ আজিম তালুকদার ভীষণ অসুস্থ সেই পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে অনেককেই আর দেখতে পেলেন না। ব্যতীত হলেন তিনি। এর চেয়ে বেশী মর্মাহত হলেন মুসলমানদের দুর্দশা দেখে। তিনি আঁতকে উঠলেনকুসংস্কার, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অভাব দারিদ্র্য আর শোষণ নির্যাতনের বাস্তব চিত্র। ইংরেজদের শোষণ আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ গ্রাম-শহরের মানুষপাড়া-গ্রামে চলছে অত্যাচারী জমিদার, মহাজন আর নীল করদের একচেটিয়া শোষণ-নির্যাতন। এবং অবস্থা হতে পরিত্রাণের পথ খুজতে থাকলেন।

তিনি দেখলেন, মুসলমানরা রোযা-নামাযসহ আল্লাহর ইবাদাত ছেড়ে দিয়ে, আপন সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে কুসংস্কারের সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেছে দীর্ঘকাল হিন্দুদের দ্বারা প্রভাবিত হবার কারণে হিন্দুয়ানী আচার অনুষ্ঠান ও হিন্দু সংস্কৃতিতে তারা গা ভাসিয়ে দিয়েছেতাদের এই অধঃপতন দেখে খুবই মর্মাহত হলেন শরীতুল্লাহতিনি মানুষকে ইসলামের মর্মকথা শুনাতে শুরু করলেন। কিন্তু গ্রামের মুসলমানরা এতোটাই অন্ধকারে ডুবেছিলো যে, হাজী শরীয়তুল্লাহর শত আহ্বানেও তারা সাড়া দেয়নিআপন গ্রামের মানুষকে সত্যের পথে ডেকে যখন তিনি তাদের কোনো সাড়া পেলেন না, তখন কিছুটা হতাশ হয়ে আবারো মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা করলেন

মক্কা যাবার পথে প্রথমে তিনি বাগদাদে যানসেখানে তিনি নবীজীর আদরের নাতি ইমাম হুসাইনের পবিত্র মাজার জিয়ারত করেনমক্কায় আসার পথে তিনি বড়পীর আব্দু কাদের জিলানী, ইমামে আযম হানীফা, ইমাম বাকের সাদিক-এর কবর জিয়ারত করেন। এরপর তিনি বাইতুল মাকদিস ও মিসর সফর শেষে পৌঁছে যান পবিত্র মক্কায়পথে তিনি মিশরের বিশ্ব বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়ায়ে আল-আযহারে ভর্তি হয়ে হাদীস, তাফসির ফিকাহ ও দর্শন শাস্ত্রে এক বছর ধরে গবেষণা করে জ্ঞান অর্জন করেন। তার প্রচন্ড মেধা দেখে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি মাত্র কিছুদিন শিক্ষকতার করানো পর ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন।

মক্কায় পৌঁছে হাজী শরীয়তুল্লাহ পুনরায় খোঁজ করেন তাঁর প্রিয় শিক্ষক মওলানা তাহের আলীকে তাঁর সাথে সাক্ষাতের পর তিনি আবারো হজ পালন করেনতারপর রওয়ানা হলেন মদীনার পথে এরপর মদীনায় গিয়ে নবীজীর (সা) মাজার জিয়ারত করতে মদীনায় যান

রাসূলের (সা:) পবিত্র রওজা মুবারকে দাঁড়িয়ে হাজী শরীয়তুল্লাহ স্বদেশের মুসলমানদের বিপর্যয়ের কথা স্মরণ করে তাদের মুক্তি ও হিদায়েতের জন্যে বিশেষভাবে দোয়াও করেন  

দুবছর মক্কা ও মদীনা সফর করার পর ১৮২০ সালে হাজী শরীয়তুল্লাহ দেশে ফিরে আসার জন্য রওয়ানা দিলেন এবার দেশে ফিরে দেখেন অন্য অবস্থা চারদিকে জেগে উঠেছে মজলুম জনতাহিন্দু জমিদার এবং ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছে সংগ্রামী জনতা। এসব দেখে তিনি অত্যন্ত খুশী হলেন

তিনিও এই আন্দোলনে শরীক হলেন। হিন্দু জমিদার এবং ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে আরো সচেতন করে তোলার জন্য নানা কাজ শুরু করলেন। অধঃপতিত মুসলমানদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে তুলে আনার জন্যে তিনি ব্যাপকভাবে দীনি দাওয়াতের কাজ শুরু করলেনসাধারণ মুসলমানকে নৈতিক শিক্ষায় তিনি উদ্বুদ্ধ করে তোলেনএকইসাথে তিনি ইংরেজ এবং অত্যাচারী জমিদার হিন্দুদের বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ানোর জন্য আহবান জানালেনদেশে ফেরার পর লোকেরা জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার কারণে তাকে কুতুবুল বাঙ্গালউপাধি দেন

ওই সময় ইংরেজদের পাশাপাশি তাদের অধিনস্ত হিন্দু জমিদারদের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হ মুসলমানরাএসব অত্যাচার দেখে শরীয়তুল্লাহ মর্মাহত হলেন। এই অত্যাচার হতে তাদের বাচানোর জন্য তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন। অন্যদিকে ঘুমন্ত জনতা েগে ওঠেছে। বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। শরীয়তুল্লাহ ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তি আন্দোলনেবাংলার গ্রামে গ্রামে ঘুরে ফিরে নির্যাতিত মুসলমানদের মাঝে তিনি ইসলামের শিক্ষা ও আদর্শ প্রচার করেনতাদেরকে নিয়ে গড়ে তোলেন ফরায়েজী আন্দোলনওই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল, অত্যাচারী জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকদের হাত থেকে মুসলিম জাতিকে রক্ষা করা হাজী শরীয়তুল্লাহর এই আন্দোলনের নাম ছিল ফরায়েজী আন্দোলন' আরবী ফরজ' শব্দের বহুবচন হচ্ছে, ‘ফরিজাহ'আর যারা আল্লাহর নির্দেশিত অবশ্য কর্তব্যসমূহ পালনের অঙ্গীকার করে তাদেরকেই ফরায়েজী' বলা হয়যারা ইসলামের ফরজসমূহ পালন করতে রাজি তারাই কেবল ফরায়েজী আন্দোলনের সদস্য হতে পারতো

হাজী শরীয়তুল্লাহ খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মুসলমানকে এই আন্দোলনের সদস্য করে তুলেছিলেনফরায়েজী সদস্য এবং সাধারণ মুসলমানকে ধর্মের সাথে কর্মের মিল রাখার জন্যে তিনি কঠোরভাবে নির্দেশ দিলেনহাজী শরীয়তুল্লাহর আন্দোলন সম্পর্কে জেমস টেইলার বলেন,‘কুরআনকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করাই ছিলো ফরায়েজী আন্দোলনের উদ্দেশ্য' অন্যদিকে জেমস ওয়াইজের মতে, ‘শিরক ও বিদআত থেকে স্থানীয় মুসলমানদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে হাজী শরীয়তুল্লাহই পূর্ববঙ্গের ইসলামের প্রথম সংস্কারক ও প্রচারক'

ইংরেজ আমলে হিন্দু জমিদাররা গরু কুরবানী নিষিদ্ধ করেছিলকিন্তু হাজী শরীয়তুল্লাহ এই নিষেদ অমান্য করে গরু কুরবানী দিলেনএরপর তিনি অন্যান্য মুসলমানকেও গরু কুরবানী দিতে বললেনসে সময় কেউ দাঁড়ি রাখলে জমিদারদের ট্যাক্স দিতে হতোশরীয়তুল্লাহ তাও দিতে নিষেধ করলেনওই সময় হিন্দু জমিদাররা মুসলমান কৃষকদের কাছ থেকে কালীপুজা, দুর্গা পুজা প্রভৃতি অনুষ্ঠানে কর আদায় করতো ; শরীয়তুল্লাহ তা দিতেও মানা করলেন

খোয়াজ খিজিরের নামে কলা গাছের ভেলা ভাসানো, বিবি ফাতেমার পূজা, দশেরা ও রথযাত্রা, চড়ক পূজা, হাসান-হোসাইন উপলক্ষে রক্তঝরানো, বুক চাপড়ানো ও হিন্দু ধাত্রীসহ অনেক কিছু তিনি নিষিদ্ধ করেনতিনি আব্দুল কাদের জিলানী (রা.)-এর তাসাউফের অনুসারী ছিলেন

তিনি মুসলিম সমাজের অস্পর্শতা, জমিদার, পাঠান ও জোলাসহ অন্যান্য উপাধি নিষিদ্ধ করে সকল মুসলমানকে ভাই ভাই হিসেবে আখ্যায়িত করেনতিনি মুসলমানদেরকে ধুতি পরা নিষেধ করে লুঙ্গি-পায়জামা পরার নির্দেশ দিয়েছেন দৈনিক দুইবার জিকির করা ও ওয়াজ মাহ্ফিল এবং মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতেন এ সময়ে তিনি বুঝলেন, ইসলাম কেবল একটি ধর্মের নাম মাত্র নয় বরং একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থার নাম -ইসলাম

হাজী শরীয়তুল্লাহর এই সাহসী তৎপরতায় ক্ষেপে গেলো অত্যাচারী হিন্দু জমিদার এবং ইংরেজরাফরায়েজীদের উপর শুরু ইংরেজ হিন্দু জমিদারদের অত্যাচার। তাদের সাথে বহু জায়গায় সংঘর্ষ হলোকিন্তু পিছু হটলো না ফরায়েজীর কর্মীরা। তারা শরীয়তুল্লাহ নেতৃত্বে সংঘর্ষ মোকাবেলা করতে শুরু করলেন। যতোই বাধা আসতে থাকলো, ততোই বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকলো ফরায়েজী আন্দোলনের তীব্রতা।

শরীয়তুল্লাহর এই ফরায়েজী আন্দোলন-সংগ্রাম অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর ফরিদপুরের গ্রামে গ্রামে। এমনকি এক সময় এই আন্দোলন দক্ষিণ বাংলার অধিকাংশ জায়গায় ছড়িয়ে পড়েফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঢাকা, ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা প্রভৃতি জিলায়ও এই ফরায়েজী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আর এই সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলো সমাজের দরিদ্র কৃষক শ্রেণী যারা হিন্দু জমিদার ও ইংরেজদের অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিলোহাজী শরীয়তুল্লাহর এই সাহসী আন্দোলন ছিলো সত্যের পক্ষে আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে

১৮৩১ সালের ২৯ এপ্রিল ঢাকা-জালালপুরের ফৌজদার আইন সম্পর্কিত রিপোর্টে (রুবকারী) অনুযায়ী দেখা যায়, ধর্মীয় বিষয়ে শরীয়াতুল্লাহর অনুসারী এবং রামনগর গ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে ১৮৩১ সালে সহিংসতা দেখা দিয়েছে।

 

১৮৩১ সালে ফরায়েজী আন্দোল একদিকে রক্ষণশীল মুসলমানদের সঙ্গে এবং অন্যদিকে হিন্দু জমিদারদের সঙ্গে প্রবল সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। এরপর সময় যত গড়াতে থাকে ততোই সংঘাত বাড়তে থাকে। এভাবে সংঘাত ও সনাতন পন্থীদের বিরোধের পরও ফরায়েজীগণ শক্তিশালী ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ববোধের মাধ্যমে একটি সম্প্রদায়ে পরিণত হয়।

হিন্দু জমিদার ও রক্ষণশীল মুসলমান এবং ব্রিটিশ সরকারের রোষাণলে পড়ে অসংখ্য বার নির্যাতনের শিকার হন। ১৮২২-৩৯ সাল পর্যন্ত হাজী শরীয়াতুল্লাহকে ব্রিটিশ পুলিশ বহুবার গ্রফতার করে। কয়েকবার তার উপর অমানুষিক নির্যাতন চালোনো হয়।

ব্রিটিশ পুলিশ তাকে বার বার আটক করলে তার কোনো অপরাধ প্রমাণ করতে পারেনি। যে কারণে তাকে বেশী দিন থানা হাজতে আটকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তিনি সবসময়ই নিজেকে একজন ধর্মীয় সংস্কারক হিসেবে হিসেবে প্রমাণ করেছেন।

১৮৩৭ সালে তাঁর এই সংগ্রামী আন্দোলনের সদস্য সংখ্যা ছিলো বারো হাজারএই বিপুল সংখ্যক সদস্যের বাইরেও ছিলো একটি বিশাল জনশক্তি ; যারা তাঁর আন্দোলনকে সকল সময় সমর্থন ও সহযোগিতা করতো ফরায়েজী আন্দোলন ধর্মী সংস্কারের উদ্দেশ্যে সূচিত হলেও পরর্তিতে এটি কৃষকদের আন্দোলনে রূপ লাভ করেশরীয়তুল্লাহ শুধু ধর্মী সংস্কারক ছিলেন না, বরং কৃষক, তাঁতি এং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে অন্যায়-অত্যচার ও শোষণের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য  এই সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন

এসময় দেখা যায় ফরায়েজী বিরোধীরা সাধারণত একাদিক পীরের উপসনা করতো কিন্তু ফরায়েজীরা তা করতো না। ফরায়েজীগণ ছিল শুদ্ধবাদী, যারা ওহাবীদের মতো পুনরুজীবনবাদী। তারা ছিল তাইউনী হাল অর্থাৎ হানাফী মাজাহাবের। অবশিষ্ট মুসলমানরা ছিল কুসংস্কারে আছন্ন, যারা স্থানীয় আচার পালনে অভ্যস্থ, যারা পীরপূজার প্রতি আস্থাবান ছিলেন। তারা ছিল তাইউনী । এর নেতৃত্বে ছিল মাওলানা কেরামত আলী। মাওলানা কেরামত আলী ১৮৩৯ সালে তাইউনী শুরু করলে ফরায়েজীরা তাইউনী হালনাম ত্যাগ করে।

হাজী শরীয়তুল্লাহ ১৮৪০ সালের ২২ জানুয়ারী মারা যান। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিলো ৫৯ বছর।

 

তথ্যসূত্র:

ফরিদপুরের ইতিহাস ঐতিহ্য

বাংলার কৃষক আন্দোলন_আমজাদ হোসেন

বাংলার মুক্তি-সন্ধান_রাখী চট্টোপাধ্যায় ও সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

বাংলায় ফরায়েজী আন্দোলনের ইতিহাস_মুঈন উদ-দীন আহমদ খান

ব্রিটিশ ভারতীয় নথিতে তিতুমীর ও তার অনুসারীরা_ড. মুঈনউদ্দীন আহমদ খান

www.dcfaridpur.gov.bd

ও বিভিন্ন ওয়েব সাইট

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.