বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী : বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, দেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি, জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য বিচারপতি ছিলেন আবু সাঈদ চৌধুরীর। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্ববিবেক জাগ্রতকারী বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর অবদান বাঙালি জাতি কোনোদিন বিস্মৃত হতে পারবে না

৭১-এ মুজিবনগর সরকারের কান্ডারি যেমন ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদ, তেমনই ইউরো-আমেরিকায় সেই ঐতিহাসিক লগ্নে বাংলাদেশ সরকারের কান্ডারি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী সপরিবারে জেনেভায় অবস্থান করছিলেনবাংলাদেশের ভয়াবহ পরিস্থিতির সংবাদ জানতে পেরে তিনি শীঘ্রই লণ্ডন চলে আসেন এবং বৃটেনে অবস্থানরত সর্বস্তরের বাঙালির সভা আহ্বান করেনসে সভাতেই বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রাম কমিটি/পরিষদ নামে চারটি আঞ্চলিক কমিটি গঠন করা হয়

এছাড়াও বিশটি শহরে বিশটি সংগ্রাম কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়তখন বৃটেনে প্রায় ৭০ হাজার প্রবাসী বাঙালি ছিলেনবিশটি শহর কমিটি, আঞ্চলিক কমিটি, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সর্বপ্রকার কর্মকাণ্ড মনিটরিং করার জন্য এ্যাকশন কমিটি ফর দি পিপল্স রিপাবলিক অব বাংলাদেশএবং স্টিয়ারিং কমিটি অব দি পিপল্স রিপাবলিক অব বাংলাদেশনামে দুটি কমিটি গঠন করা হয়১১নং গোরিং ষ্ট্রিট, লণ্ডনে এ কমিটি গুলোর সদর দপ্তর এবং কেন্দ্রীয় কমিটি নামে অভিহিত ছিলএসব কমিটির মূল ব্যক্তি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী

লণ্ডনের হামব্রোজ ব্যাংকে বাংলাদেশ ফান্ডনামে একটি একাউন্ট খোলা হয়প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং বৃটিশ এম.পি জন স্টোন হাউস উক্ত এ্যাকাউন্ট পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেনআর এ ফান্ডের এ্যাকাউন্টেট জেনারেল ছিলেন জনাব মজিবুর রহমান

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মিশরেরদপ্তর খোলা হয় এবং যথারীতি সেখানে সকল কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে থাকেএভাবে মুক্তিযুদ্ধের ৯/১০ মাস ব্যাপক কাজকর্ম মূল নায়ক ছিলে তিনি। ১৯৭২ সালের ১০ইং জানুয়ারি তিনি বাংলার মাটিতে পা রাখেনপ্রবাসে অবস্থান করে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিলেন।

বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী জন্ম ১৯২১ সালের ৩১ জানুয়ারি। টাঙ্গাইল জেলার নাগরবাড়ির এক জমিদার পরিবারে। তার পিতা আব্দুল হামিদ চৌধুরী। তিনি পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার ছিলেন

আবু সাঈদ চৌধুরী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। তারপর ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন১৯৬০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাডভোকেট জেনারেল এবং ১৯৬১ সালে হাইকোর্টের বিচারপতি নিযুক্ত হন১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন

একাত্তরের মার্চ মাসে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অধিবেশনে যোগদানের জন্য জেনেভা যানসেখানে জেনেভার একটি পত্রিকায় দুজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের মৃত্যু সংবাদ দেখে ২৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক শিক্ষা সচিবকে পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে প্রেরিত এক পত্রে লেখেন, “আমার নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গুলি চালানোর পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেইতাই আমি পদত্যাগ করলাম

১৯৭১ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে তিনি প্রথম বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনস্বাধীনতার পর তিনি ঢাকায় ফিরে আসলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন১২ জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেনতিনি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ছিলেন

১৯৮৭ সালে ৬৬ বছর বয়সে তিনি লন্ডনে মারা যান

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.