পণ্ডিত রবি শংকরের ৯০তম জন্মদিন

২০১০ সাল৭ এপ্রিলপণ্ডিত রবি শংকরের ৯০তম জন্মদিনশুভ জন্মদিন রবি শংকরআমরা তোমাকে ভুলিনিকোনো দিনও ভুলব নাভুলিনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তোমার অবদানের কথাবাংলাদেশের মানুষের অন্তরে তুমি রবে চিরদিনতোমার কর্ম আমাদেরকে মানুষের প্রতি মানুষের যে দায়িত্ব_সে সম্পর্কে প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা যোগাবেতোমার চেতনা আমাদেরকে মানুষথেকে মনুষ্যত্বের মানুষে রূপান্তরিত করবে

"রবি শংকর হচ্ছেন বিশ্ব সঙ্গীতের দেবপিতা" - জর্জ হ্যারিসনরবি শংকর সেতারবাদনের বিশ্ব সম্রাটএই শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী সুপরিচিতবাঙালি সঙ্গীতজ্ঞের তিনি বিংশ শতাব্দীর একজন কিংবদন্তিরবি শংকর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ঐতিহ্য এবং ভারতীয় সঙ্গীতকে পাশ্চাত্য বিশ্বের কাছে প্রথম তুলে ধরেনভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মাইহার ঘরানার স্রষ্টা আচার্য আলাউদ্দীন খান সাহেবের  শিষ্য ছিলেন রবি শংকরতাঁর সঙ্গীত জীবনের পরিব্যাপ্তি ছয় দশক জুড়েরবি শংকর দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সঙ্গীতকর্ম জীবনের জন্য গিনেস রেকর্ডের অধিকারী

পন্ডিত রবি শংকরের জন্মেছিলেন ১৯২০ সালের ৭ এপ্রিলভারতের উত্তরপ্রদেশের বারাণসী শহরেতাদের আদি পৈত্রিক বাড়ি ছিল বাংলাদেশের নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলায়রবি শংকরের মূল নাম রবীন্দ্র শংকরছোটবেলায়ায় তাঁর ডাক নাম ছিল রবুঅনেকে রবি বলেও ডাকতেন

তাঁর বাবা শ্যাম শংকরতিনি ছিলেন একজন প্রথিতযশা জ্ঞানী, রাজনীতিবিদ এবং আইনজ্ঞমা হেমাঙ্গিনীরবি শংকর ছিলেন চার ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোটবড় ভাই উদয় শংকর ছিলেন বিখ্যাত ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পীওই সময়ে তাঁর বড় ভাই উদয় শংকর ছিলেন প্যারিসে১৯৩০ সালে রবি শংকর মায়ের সাথে প্যারিসে বড় ভাইয়ের কাছে যান এবং সেখানেই আট বছর স্কুলে শিক্ষা গ্রহণ করেনবার বছর বয়স থেকেই রবি শংকর বড় ভাইয়ের নাচের দলের একক নৃত্যশিল্পী ও সেতার বাদকঐ বয়স থেকেই তিনি অনুষ্ঠান করে বেড়িয়েছেন ভারত ও ইউরোপের বিভিন্ন শহরে

১৯৩৮ সালে, আঠারো বছর বয়সে রবি শংকর বড় ভাই উদয় শংকরের নাচের দল ছেড়ে মাইহারে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অমর শিল্পী আচার্য আলাউদ্দীন খান সাহেবের কাছে সেতার বাজানোর দীক্ষা নেনদীক্ষা গ্রহণকালে তিনি আচার্যের পুত্র সরোদের অমর শিল্পী ওস্তাদ আলী আকবর খানের সংস্পর্শে আসেনতাঁরা পরবর্তীতে বিভিন্ন স্থানে সেতার-সরোদের যুগলবন্দী বাজিয়ে শোনান১৯৩৮ হতে ১৯৪৪ সাল পর্যন্তগুরুগৃহে রবি শংকর দীর্ঘ সাত বছর সেতারে সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেন১৯৩৯ সালে ভারতের আহমেদাবাদ শহরে রবি শংকরের সর্বপ্রথম সাধারণের জন্য উন্মুক্ত একক সেতার পরিবেশন করেনসেই শুরু থেকে আজ পর্যন্ত পন্ডিত রবি শংকর সঙ্গীতজ্ঞ, সঙ্গীত স্রষ্টা, পারফর্মার এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একজন পণ্ডিত হিসেবে পরিচয় রাখতে সক্ষম হয়েছেন

তিনি সুর সৃষ্টি, ব্যালের জন্য সঙ্গীত রচনা এবং চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেনএই সময়ের বিখ্যাত ধরত্রী কি লাল এবং নীচা নগর চলচ্চিত্র দুটির সঙ্গীত রচনা ও সুরারোপ করেনতিনি কবি ইকবালের সারে জাঁহাসে আচ্ছা কবিতাকে অমর সুরে সুরারোপিত করে জনপ্রিয় গান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন

১৯৪৯ সালে রবি শংকর দিল্লীতে অল ইন্ডিয়া রেডিওর সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে যোগ দেনওই সময়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বৈদ্যবৃন্দ চেম্বার অর্কেষ্ট্রা১৯৫০ হতে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত রবি শংকর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সঙ্গীত সৃষ্টিতে ব্যাপৃত ছিলেনএ সময়ে তাঁর উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হলো সত্যজিৎ রায়ের অপু ত্রয়ী (পথের পাঁচালী, অপরাজিত ও অপুর সংসার) চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনাপরবর্তীতে তিনি চাপাকোয়া (১৯৬৬) চার্লি (১৯৬৮) ও গান্ধী (১৯৮২) সহ আরো চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন১৯৬২ সালে পন্ডিত রবি শংকর কিন্নর স্কুল অব মিউজিক, বম্বে এবং ১৯৬৭ সালে কিন্নর স্কুল অব মিউজিক, লস এন্‌জেলেস স্থাপন করেন

রবি শংকরের সঙ্গীত ব্যক্তিত্বের দুটি ভিন্ন দিক রয়েছে: উচ্চাঙ্গ সেতার শিল্পী হিসেবে তিনি সব সময়ই ঐতিহ্যমুখী ও শুদ্ধতাবাদী; কিন্তু সঙ্গীত রচয়িতা হিসেবে তিনি সব সময়ই নিজের সীমাকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছেন১৯৬৬ সালে বিটলস্-এর জর্জ হ্যারিসনের সাথে যোগাযোগের আগে থেকেই তিনি সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারা ও তার প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেনএ সময় তিনি জ্যাজ সঙ্গীত, পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও লোকসঙ্গীত নিয়ে কাজ করেছেন

১৯৫৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রবি শংকর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বাহক হিসেবে তাঁর সেতারবাদনকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রথম তুলে ধরেন১৯৫৬ সালে তিনি ইউরোপ ও আমেরিকায় সঙ্গীত পরিবেশন করেনএ সময় তিনি এডিনবার্গ ফেস্টিভালে এবং বিখ্যাত সঙ্গীত মঞ্চ রয়াল ফেস্টিভাল হলেও বাজিয়েছেন

১৯৬৫ সালে বীটলস্-এর জর্জ হ্যারিসন সেতারের সুর নিয়ে গবেষণা শুরু করলে রবি শংকরের সাথে তাঁর যোগাযোগ তৈরী হয় এবং পরবর্তীতে তা বন্ধুত্বে পরিণত হয়এই বন্ধুত্ব রবি শংকরকে অতিদ্রুত আন্তর্জাতিক সঙ্গীত পরিমন্ডলে নিজস্ব অবস্থান সৃষ্টিতে সাহায্য করেরবি শংকর পপ সঙ্গীতের গুরু জর্জ হ্যারিসনের "মেন্টর" হিসেবে পাশ্চাত্য সঙ্গীত জগতে গৃহীত হনএর ফলে রবি শংকরকে এমন সব সঙ্গীত উৎসবে সঙ্গীত পরিবেশনের আমন্ত্রণ জানানো হয় যা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশনের উপযোগী পরিবেশ নয়এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো "মন্টেরী পপ ফেস্টিভ্যাল", মন্টেরী, ক্যালিফোর্নিয়া; এ অনুষ্ঠানে ওস্তাদ আল্লারাখা তবলায় সঙ্গত করেছিলেন১৯৬৭ সালে তাঁর আমেরিকার অনুষ্ঠানমালা তাঁকে এক অভাবনীয় সফলতা এনে দিয়েছিলঅনুষ্ঠানের পর তাঁকে বিভিন্ন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেবার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিলএছাড়াও ১৯৬৯ সালে তিনি উডস্টক ফেস্টিভ্যালে সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন

দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ১৯৭১ সালে ১ আগষ্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক শহরের মেডিসন স্কয়ারে যুদ্ধ কবলিত বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য এবং সাহায্যের হাত বাড়াতেই পণ্ডিত রবি শংকরের (ভারত উপমাহাদেশের কিংবদন্তী সেতারবাদক) অনুরোধে জর্জ হ্যারিসন কনসার্ট ফর বাংলাদেশবেনিফিট সঙ্গীত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেনকনসার্টটি আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন বিট জেনারেশনের সৃষ্টিকারী বিটলস-এর জর্জ হ্যারিসনএই কনসার্ট থেকে সংগৃহীত ২,৫০,০০০ ডলার বাংলাদেশের উদ্বাস্তুদের জীবন বাঁচানোর জন্য দেয়া হয়সেই কনসার্ট হয়ে গেল কিংবদন্তী এইটি দেশের স্বাধীনতার সমর্থনে, দেশে চলমান জেনোসাইডের প্রতিবাদে সেই সময়ের সারা বিশ্ব কাপানো সংগীত শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেন এই কনসার্টেমুলত শরনার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা এবং স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রের সাহায্যার্থে এই কনসার্টের উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেতার সম্রাট রবিশংকরসেই উদ্যোগ শুধু আর্থিক সহযোগিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনিবরং বাংলাদেশের অস্তিত্বের কথা, চলমান গণহত্যার কথা, লক্ষ লক্ষ দেশান্তরী শরনার্থীর কথা সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছিল, পাকিস্তানের হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে এবং বিশ্ব জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিলবরং সেই সময়ে আমেরিকান সরকার বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করলেও ওই দেশের জনমত ছিল বাংলাদেশের পক্ষেজাতিসংঘের ইউনিসেফ জর্জ হ্যারিসনের সেই অবদানের স্মরণে একটি বিশেষ ফাণ্ড তৈরী করেছে দ্য জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফ

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপক্ষে প্রচার ও মানবিক সহায়তার জন্য জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগে নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে আয়োজিত "কনসার্ট ফর বাংলাদেশ" অনুষ্ঠানে সেতার বাজিয়েছিলেনপন্ডিত রবি শংকরই মূলতঃ এই অনুষ্ঠানের জন্য জর্জ হ্যারিসনকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেনবাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে "কনসার্ট ফর বাংলাদেশ" একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা

 

 

© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.