পাবলো নেরুদা


altআমি কবিতা লিখি নাআমি কবিও নইআপনারা আমাকে কেন কবি বলেন, তা আমি জানি নাআমি শুধু শ্রমিকের সেঁত-সেঁতে ঘামের গন্ধ নিতে চেষ্ঠা করি, শোরারের গর্ত থেকে (ক্ষণি থেকে) শ্রমিক যখন উঠে এসে একটু বিশ্রাম নেয়_ তখন তাঁর চোখের ভাষা বোঝার চেষ্ঠা করি, তাঁদের জীবন ও জীবনের বোধ-অনুভূতি-কষ্টগুলো উপলদ্ধি করি এবং তা কোনো কাগজে লিখে রাখি নিজেরই প্রয়োজনেবলুন এজন্য কি আমাকে কবি বলা যায়? আমি কবি হতে চাই নাআমি তাঁদের একজন বন্ধু হতে চাই।-----পাবলো নেরুদা

পাবলো নেরুদা অবশ্য নিজেকে রাজনৈতিক কবি মনে করতেন নাআবার নিজেকে ভাবাদর্শিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ কবিতার প্রতিনিধি হিসেবে চিহ্নিত করে শ্রেণীভুক্ত করার সমালোচকদের প্রচেষ্টার নিন্দাও করেছেন

 

কুকুরটি বেঁচে নেই

আমি তাকে বাগানের মাঝামাঝি কবর দিয়েছি

এখন আমাকে ভীষণ শক্তিহীন মনে হচ্ছে

তার সাথে বহুদিন সঠিক পথেই হেঁটে গেছি

ঢেউখেলা চুলে যে হাঁটবে না আমার সাথে কোনদিন

আমি বাস্তবাদী, আকাশের শূন্যতাকে বিশ্বাস করি না

জানি আমাদের মতো কারো জন্য কোন স্বর্গ নেই

তবে কুকুরটি স্বর্গবাসি হলে আমিই সুখি হবো বেশি

এবং জানি সে আমার জন্য সেখানে অপেক্ষা করবে

প্রভূত্ব দেখাবে লেজ নেড়ে একমাত্র বন্ধুর জন্য

কুকুরটি কখনো দাসত্ব করেনি, জামার ওপর হাঁটেনি

আয়ত্বে নেবার জন্য সে কখনও ছোঁয়ায়নি চুমু

অন্যদের মতো যৌনতায় মাতেনি সে

সে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতো বন্ধু হয়ে

যতোটুকু প্রয়োজন, যতোটুকু দরকার

সে আমাকে বুঝতে চাইতো মানুষের প্রয়োজনে

মানুষ পারে না অথচ কুকুরটি পেরেছিল নষ্টপ্রহরে

স্বপ্নের চেয়েও শুদ্ধ মনে হতো তার দুচোখ

মিষ্টি এবং পশমি গন্ধময় সুন্দর দিনে

কাছাকাছি প্রশ্নহীন, আমি তার লেজ ছুঁয়ে-

সাগর সৈকতে হেঁটেছি বহুদিন

শীতে যেখানে পাখিরা নির্জন আকাশ ভরে রাখে

সেখানে আমার পশমি কুকুর সাগরে ঢেউয়ে লাফাতো

আশ্চর্য কুকুর মুহুর্তেই তার সোনারং লেজ নিয়ে

আবার দাঁড়াতো সাগরের সব জল নাড়তে

আনন্দ! কি যে আনন্দ তার!

আমার কুকুর জেনেছিল সুখী হতে হয় কোন পথে

মানুষের লজ্জাহীন দৌরাত্বের শাসন উপেক্ষা করে

সেই কুকুরের জন্য আজ কোন শোকবার্তা নেই

সে এখন বহুদুরে, আমি তাকে মাটি চাপা দিয়েছি

অথচ তার ভালোবাসা মাটি থেকে বের হয়ে আসছে

যা বহনের ক্ষমতা আজ আমারও নেই

 

নেরুদা লিখেছিলেন, ‘আমাদের সব মৃতদের নামে আমি শাস্তি দাবি করছি/ যারা চৌরাস্তায় গুলি করে হত্যা করেছে আমার ভাইকেনেরুদা বিশ্বের বিবেকবান কবিনির্যাতিত মানুষের কবিপ্রতিবাদ-প্রতিরোধের কবিশোষিত মানুষের কবিবিপ্লবের কবি

নেরুদার জন্ম ১৯০৪ সালের ১২ জুলাইচিলির পারালেতার পুরো নাম রিকার্দো নেফতালি রেয়িসই বাসোয়ালতোপাবলো নেরুদা তার নিজের নেওয়া ছদ্মনামএ নামেই তিনি পরিচিতমাত্র ১৫ বছর বয়সে পত্রিকায় কবিতা পাঠিয়ে তাঁর নিচে লিখে দিতেন_পাবলো নেরুদাতাঁর বাবা ছিলেন একজন রেল শ্রমিক আর মা ছিলেন শিক্ষয়ত্রীনেরুদার জন্মের ২ মাসের মধ্য তাঁর মা মারা যানবাবাও বেশী দিন বাঁচেননি মায়ের কাছে কেঁটেছে শৈশব

১৯২০ সালে ষোল বছর বয়সে পত্রিকায় নেরুদা নাম নিয়ে লেখালেখি শুরু১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতার বই ক্রেপুস্কুলারিও অর্থা গোধূলি লগ্নের গ্রন্থ১৯২৪ সালে প্রকাশিত হলো ভেইন্তে পোয়েমাস দে আমোর ই উনা কানসিওন দেসেসপেরাদা অর্থা কুড়িটা প্রেমের কবিতা ও একটি নিরাশার গানসাহিত্য জগতে ঝড় তুললেন এই বই দুইটির মাধ্যমেএতে ছিল ভালবাসা-প্রেম ও যৌবনের আবেদনএ নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক-বিতর্ক।  প্রশংসা করেন অনেকেইআবার সমালোচনাও কম নয়অনেক ভাষায় বই দুটোর অনুবাদ প্রকাশিত হয়

আজ রাতেই আমি লিখতে পারি

আজ রাতেই আমি লিখতে পারি সেই অসুখীতম পঙক্তিগুলো

ধরো, আমি লিখলাম নিরন্তর রাত্রি ঝরছে

আর দূরে কোথাও নীল-নীল তারারা কম্পমান

আকাশগঙ্গায় ঘুরে-ঘুরে গান গাইছে রাত্রির বাতাস

আজ রাতেই আমি লিখতে পারি সেই অসুখীতম পঙ্ক্তিগুলো

তাকে আমি ভালবাসতাম এবং সে-ও একটু-আধটু আমাকে

এমনই স্তব্ধতাখচিত রাত্রিপুঞ্জে, সে আমার বুকে লেপ্টে থাকত

অশেষ আকাশের তলে পৌনঃপুনিক চুম্বনের বনে

সে আমাকে ভালবাসত, আমিও একটু-আধটু তাকে

কার সাধ্য সেই প্রশান্ত চোখজোড়াকে না-ভালবাসে

আজ রাতেই আমি লিখতে পারি সেই অসুখীতম পঙ্ক্তিগুলো

তাকে না-পাওয়ার ভাবনাগুলোতাকে হারানোর বেদনাগুলো

বিপুল রাত্রিতে, সে নেই বলে যা বিপুলতর, আমি শুনতে চাই

আমার আত্মায় প্রান্তরের শিশির হয়ে ঝরছে কবিতারা

আমার ভালবাসা তাকে ধরে রাখতে পারেনি তো কী

অঝোরে ঝরছে রাত্রি, এবং আজ রাতে সে এখানে নেই

কথারা ফুরিয়েছেদূরে কোথাও গান গাইছে কেউদূরে

কোথাও

আহা তার বিচ্ছেদে আমার আত্মা অপূর্ণই থেকে গেল

আমার চোখ তার শরীরবর্তী হওয়ার পথ খুঁজছে

আমার সত্তা তার অস্তিত্বকেযদিও সে আর আমার নেই

একই রাত্রি একই গাছগুলোকে দুধশাদা রঙে মুড়িয়ে দিচ্ছে

বিগত সেই রাত্রিপুঞ্জের আমরাই শুধু একইরকম নেই

একথা নিশ্চিত যে, আমি তাকে ভালবাসি না আর; কিন্তু কতই না ভালবাসতাম

আমার কণ্ঠ সেই বাতাসকে খুঁজছে যে আমাকে তার কাছে শ্রতিময় করে তুলবে

অন্য কারওআজ সে অন্য কারওআহা আমার হারানো চুম্বনগুলো

তার স্বরতার রুপালি শরীরতার নিরন্তর চোখসবই আজ অন্য কারও

একথা নিশ্চিত যে আমি তাকে ভালবাসি না আর; তারপরও ভালবাসি

ভালবাসা চিরকালই ক্ষণিকেরবিস্মৃতি কতই না দীর্ঘ

এমনই স্তব্ধতাখচিত রাত্রিপুঞ্জে সে আমার বুকে লেপ্টে থাকত

আহা তার বিচ্ছেদে আমার আত্মা অপূর্ণই থেকে গেল

আজ রাতে শেষবারের মতো সে আমাকে অসুখী করুক

আর এটাই হোক তার জন্য লেখা আমার শেষ কবিতা

 (কুড়িটি প্রেমের কবিতার শেষ কবিতা)

১৯২৭ সালে সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে আর্থিক অনটনের কারণে রেঙ্গুনে (বার্মা) চিলির রাষ্ট্রদূত হিসেবে সরকারী চাকুরীতে যুক্ত হনপরবর্তী সময়ে একই দায়িত্ব পালন করেন তকালীন সিলোনের কলোম্বোয়, বাটাভিয়ায় (জাভা) ও সিঙ্গাপুরে১৯৩৪ সালে তিনি চিলির রাষ্ট্রদূত হয়ে স্পেনে যানজাভায় সাক্ষা পান মারিকা অ্যান্টোনিয়েটা হ্যাগেনার ভোগেলসাং নামে এক ডাচ তরুণীরমারিকা ছিলেন ব্যাংককর্মীবিয়ে করেন তাকে।  তাদের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি১৯৩৬ সালে তারা পৃথক হয়ে যানএরপর নেরুদার সম্পর্ক গড়ে উঠে দেলিয়া দেল কাররিল নামে এক নারীর সাথেস্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় ১৯৩৬-৩৭ সালে পারিতে ফ্রাঙ্কোর ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠন গড়ে তোলেন এবং নানা স্থানে বক্তৃতা দেন

১৯৪২ সালে নেরুদা রচনা করেন কান্তো আ স্তালিনগ্র্যাদোনামে একটি কবিতার বই১৯৪৩ সালে নুয়েভো কান্তো দে আমোর আ স্তালিনগ্রাদোনামে আরেকটি বই রচনা করেনএ দুটো কবিতায় তার কমিউনিস্ট চেতনা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ পেয়েছেএ সময় তিনি চিলির রাষ্ট্রদূত হয়ে মেক্সিকোতে ছিলেন১৯৪৫ সালের ৪ মার্চ আতাকামা মরু অঞ্চলের আন্ডোফাগাস্তা ও তারাপাকা প্রদেশের জন্য কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে সিনেটর নির্বাচিত হন নেরুদা১৯৪৪ সালের শেষের দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিলির কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন তিনি১৯৪৬ সালে র‌্যাডিক্যাল পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী গাব্রিয়েল গনজালেজ ভিদেলা তার নির্বাচনি প্রচারণার ব্যবস্থাপক হওয়ার অনুরোধ জানান নেরুদাকে

নেরুদাও তার পক্ষে প্রচারণা ১৯৫৩ সালে নেরুদা স্তালিন শান্তি পুরস্কার পানওই বছরই স্তালিন মারা যায়তাঁকে নিয়ে শোকগাঁথা রচনা করেন নেরুদাদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কিউবার ফুল গেনসিও বাতিস্তা ও পরে ফিদেল কাস্ত্রোকে প্রশংসা করে কবিতা লেখেনলেনিন সম্পর্কে বলেছেন, ‘গ্রেট জিনিয়াস অফ দিস সেনচুরিনেরুদা তার রাজনৈতিক জীবনে কমিউনিস্ট মতাদর্শ-দর্শনের উপর আস্থা কখনো হারাননি

১৯৪৫ সালে খনি শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী আইন প্রণয়নের প্রতিবাদ করায় চিলি সরকারের রোষাণলে পড়েছিলেন নেরুদা১৯৪৭ থেকে ৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি আত্মগোপনে ছিলেন১৯৪৮ সালেপ্রেসিডেন্ট প্রার্থী গাব্রিয়েল গনজালেজ ভিদেলা সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে হাত মিলিয়ে কমিউনিষ্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করেযার ফলে বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়েন নেরুদাচলে যান ইউরোপে১৯৫০ সালে ভারতে এসেছিলেন১৯৫২ সালে চিলিতে ফিরে যান১৯৫৩ সালে তিনি স্তালিন পুরুস্কার পান১৯৬৯ সালে চিলির কমিউনিস্ট পার্টি নেরুদাকে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের জন্য মনোনীত করেপরে সম্মিলিত বামফ্রন্ট সালভাদোর আলেন্দেকে সর্বসম্মত প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করলে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নেন নেরুদা১৯৭০ সালে আলেন্দে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিপুল ভোটে জয়ী হয়আলেন্দে নেরুদাকে ফ্রান্সে চিলির রাষ্ট্রদূত করে পাঠান১৯৭২ সাল পর্যন্ত সে এই দায়িত্ব পালন করেন

 ১৯৭১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পানসারাজীবন তিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেনচিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি বারবার সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন১৯৭৩ সাল নাগাদ প্রস্টেট ক্যান্সারে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়েন নেরুদা১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সান্তিয়াগোর সান্তা মারিয়া ক্লিনিকে মারা যান পাবলো নেরুদা

নেরুদার প্রকাশিত ৬৫টি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে কয়েকটি বইয়ের বাংলা নাম হলো- গোধূলিলগ্ন, ক্ষুদ্র মানুষের ঝুঁকি, মর্ত্যরে অধিবাসী ১ ও ২, তৃতীয় অধিবাসী, হে স্পেন আমার হৃদয়, স্তালিনগ্রাদের সঙ্গীত, মাচ্চু-পিচ্চুর শিখরে, মুক্তিযোদ্ধা, এই প্রান্তরের নাম হুয়ান, হে মহাসমুদ্র, আমি আছি, প্রজ্বলিত তরবারি, অনুর্বর ভূখ-, সমুদ্রের ঘণ্টাধ্বনি ইত্যাদিএছাড়া তার আত্মজীবনী 'অনুস্মৃতি' একটি অসাধারণ বই

১৯৭৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জীবনের শেষ কবিতাটি রচনা করেন নেরুদাস্পেনীয় ভাষায় কবিতাটির শিরোনাম ছিল লাস সাত্রাপিয়াস

 

নিক্সন, ফ্রেই আর পিনোচেড

আজ পর্যন্ত, ১৯৭৩ সালের

এই তিক্ত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত,

সঙ্গে বোর্জেবেরি, গাররাস্তাজু ও বানজের

অতিশয় লোভী হায়েনারা

আমাদের ইতিহাসের, তীক্ষ দন্ত জানোয়ারেরা ফালাফালা করছে

বিস্তর রক্ত আর বিস্তর আগুনে অধিকৃত পতাকা,

সম্পদের ওপর হামলে পড়া

নারকী লুণ্ঠনকারী,

ক্ষমতাবান প্রাদেশিক শাসক বিক্রীত হাজারবার

এবং বিক্রেতারা, নিউইয়র্কের

নেকড়েদের দ্বারা উত্তেজিত

যন্ত্রপাতি ক্ষুধার্ত ডলারের জন্য,

তাদের শহীদ জনতার

আত্মত্যাগের ছাপ লাগা,

বেশ্যায় পরিণত সওদাগর

আমেরিকান রুটি ও বাতাসের,

হন্তারক জল-কাদায় ভরা স্থান, পতিতা

ব্যবসায়ী প্রধানের পাল,

নির্যাতন ছাড়া যাদের নেই আর কোনও আইন

এবং ক্ষুধা করছে কষাঘাত জনতার পিঠে

যখন একটি লোক কয়লা কালো গহ্বর থেকে, শোরার খাদ ও তামার খণি থেকে উঠে এসে না বলে, বলা উচি_যেন নরকের গর্ত থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এসে একেকটি মানুষ হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতে বিকৃত মুখ, ধুলোয় খরখরে লাল চোখ___আমাকে দেখে শুস্ক প্রান্তরের মতোই চৌচির শক্ত হাতখানা বাড়িয়ে দিয়ে ঝকঝকে চোখে উসাহের সঙ্গে বলে উঠেঃ আমি তোমাকে চিনি, তুমি আমার ভাই; এটাই আমার কবিতার শ্রেষ্ঠ জয়মালা। -----প্রেম ও বিপ্লবের কবি

 

 


© 2017. All Rights Reserved. Developed by AM Julash.

Please publish modules in offcanvas position.